পৃথিবীতে প্রতিনিয়তই বিজ্ঞানের নানা বিস্ময় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। মৌলিক রসায়নের জগতে এমন কিছু উপাদান আছে, যেগুলোর নাম শুনে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরাও হতবাক হয়ে যান। এমনই এক অতি দুর্লভ মৌল হলো “এস্তেতিন” (Astatine)। নামটি হয়তো অনেকের কাছেই অপরিচিত, কিন্তু এই মৌলটির পরিচয় এবং এর বৈশিষ্ট্য জানতে পারলে আপনি চমকে উঠতে বাধ্য হবেন। পৃথিবীর মোট মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে দুর্লভ—এমনকি এতটাই বিরল যে, সমগ্র পৃথিবীতে এর উপস্থিতি মাত্র ২৮ গ্রাম! এ তথ্য শুনে যেকোনো সাধারণ মানুষ যেমন বিস্মিত হবেন, তেমনি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি এক অসাধারণ ঘটনা।
এস্তেতিন মৌলটির প্রতীক হলো At এবং এর পারমাণবিক সংখ্যা ৮৫। এটি হ্যালোজেন গ্রুপের একটি উপাদান, যার মধ্যে ক্লোরিন, ব্রোমিন, আয়োডিনের মতো মৌলগুলোর অবস্থান রয়েছে। তবে অন্যান্য হ্যালোজেনের তুলনায় এস্তেতিন অনেক বেশি অস্থির এবং বিকিরণশীল। এটি একটি তেজস্ক্রিয় মৌল, যার কারণে এটি প্রাকৃতিকভাবে খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া যায় এবং অতি দ্রুত এটি ভেঙে পড়ে অন্য মৌলে রূপান্তরিত হয়। এই ভেঙে পড়ার ঘটনাটি ঘটে পারমাণবিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার (radioactive decay) মাধ্যমে, যা একে করে তোলে আরও দুর্লভ ও ক্ষণস্থায়ী। এস্তেতিনের বিভিন্ন আইসোটোপ রয়েছে, তবে সবগুলোই অস্থির এবং খুব অল্প সময় বেঁচে থাকে।

প্রথমবারের মতো এস্তেতিন আবিষ্কৃত হয় ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন বিজ্ঞানী ডেল কর্সন, কেনেথ ম্যাকেনজি এবং এমিলিও সেগ্রে’র দ্বারা। তারা এটি কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করেন বিস্ময়কর এক নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে। বাইসমাথ (Bi) মৌলকে আলফা কণার আঘাতে তারা এস্তেতিন তৈরি করেন। এরপর থেকেই এই মৌলটি বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও এটি প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীতে পাওয়া যায়, তবে এত অল্প পরিমাণে যে, তা শনাক্ত করাও চরম দুঃসাধ্য ব্যাপার। প্রকৃতিতে এর যে সামান্য পরিমাণ উপস্থিতি আছে, তা মূলত ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের ক্ষয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে, মোট পরিমাণ হিসাব করলে দেখা যায়, পুরো পৃথিবীতে মাত্র ২৮ গ্রাম এস্তেতিন বিদ্যমান।
তবে এই পরিমাণ ২৮ গ্রাম নির্ধারিত হয়েছে একটি গাণিতিক অনুমানের ভিত্তিতে। যেহেতু প্রাকৃতিক এস্তেতিন এতটাই দুর্লভ যে, সরাসরি সংগ্রহ করে তা পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব, তাই বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম আকরিকের ক্ষয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে পরিমাণ এস্তেতিন তৈরি হয়, তার গাণিতিক হিসাব করে এই সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন। এই পরিমাণ যদি পৃথিবীর সমগ্র ভূত্বকের পরিসরের হিসাব অনুযায়ী ভাগ করে দেখা যায়, তাহলে প্রতিটা কেজি মাটিতে এস্তেতিনের উপস্থিতি হয়তো একেবারে অণু-পরমাণু মাত্রায় হবে।
এস্তেতিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর তেজস্ক্রিয়তা। এটি খুব দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং এই ক্ষয়ের ফলে নানা ধরনের বিকিরণ ছড়ায়, যেমন আলফা কণা, বিটা কণা ইত্যাদি। এই কারণে এটি মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে একইসাথে বিজ্ঞানীরা এর এই তেজস্ক্রিয় গুণকে কাজে লাগানোর চিন্তাও করছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে, ক্যানসার কোষ ধ্বংসে ব্যবহৃত রেডিওথেরাপিতে এস্তেতিনের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। বিশেষ করে At-211 নামক আইসোটোপটির প্রতি গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে, কারণ এটি একটি আলফা-নির্গমক তেজস্ক্রিয় মৌল, যা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে পারলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম।

তবে এতটাই বিরল এবং উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে এস্তেতিন নিয়ে গবেষণা করাও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি গবেষণাগারেই এস্তেতিন নিয়ে সীমিত পরীক্ষা চালানো সম্ভব হচ্ছে। কারণ এটি সংগ্রহ করতে হলে বিশেষ ধরনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া এবং মহার্ঘ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। এটি সংরক্ষণ করাও কঠিন, কারণ এর তেজস্ক্রিয়তা এমনই যে, সাধারণ পাত্রে রাখলে তা দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায় এবং আশেপাশের বস্তু বা পরিবেশকে দূষিত করতে পারে। তাই একে সংরক্ষণ করতে হয় সীসা-আবৃত বিশেষ কন্টেইনারে, যেখানে বিকিরণ বাইরে ছড়াতে না পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, এত কম পরিমাণে পাওয়া যাওয়ার কারণে এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলো পুরোপুরি জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা অনুমানভিত্তিক কিছু তথ্য দিয়েছেন—যেমন এটি হয়তো ধাতব-সদৃশ গুণাবলীর অধিকারী হতে পারে, অর্থাৎ এটি ধাতব এবং অধাতব বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ নমুনা না থাকায় পরীক্ষাগারে এ নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব হয়নি। আবার যেহেতু এটি হ্যালোজেন পরিবারের সদস্য, তাই এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হ্যালোজেনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে, যেমন ধাতুর সাথে লবণ তৈরি, বা জৈব যৌগের সাথে বিক্রিয়া। কিন্তু এ সবই এখনো সীমিত পরীক্ষালব্ধ এবং অনেকটাই অনুমানভিত্তিক।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর বা সাইক্লোট্রন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে এস্তেতিন উৎপাদন করতে। তবে সেই উৎপাদন সীমিত পরিসরের জন্যই সম্ভব, কারণ এর অস্থিরতা এতটাই বেশি যে, উৎপন্ন হওয়ার পরপরই এটি ক্ষয়ে যেতে থাকে। তাই এই মৌলকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন। এর তেজস্ক্রিয় অর্ধায়ু সাধারণত মাত্র কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যা গবেষণার জন্য একটি বড় সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে।
তবে একথা সত্য যে, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ মৌল হিসেবে এস্তেতিন বিজ্ঞানীদের মনে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ যেন বিজ্ঞানের রহস্যময় এক রত্ন, যার খোঁজ পাওয়া গেছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি তার ভেতরের গহিন রহস্য। পৃথিবীর বহু মৌল আজ আমাদের হাতে, গবেষণাগারে, ওষুধে, প্রযুক্তিতে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এস্তেতিন সেই বিরল শ্রেণির মৌল, যা আমাদের চোখের সামনেই ধরা দেয়, আবার মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। তার অস্তিত্ব আছে, অথচ নেই—এক অলৌকিক দ্বৈততা!

এস্তেতিনের এই অদৃশ্য উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি কত অসীম রহস্যময় এবং বিজ্ঞান সেই রহস্য উদ্ঘাটনের নিরন্তর প্রচেষ্টা মাত্র। হয়তো কোনো একদিন প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে আমরা এই দুর্লভ মৌলকে আরও ভালোভাবে চিনতে পারব, তার গঠন, রাসায়নিক ধর্ম, এবং প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব। তখন হয়তো ক্যানসারের মতো মারণ রোগের প্রতিরোধে বা অন্য কোনো অজানা চিকিৎসা পদ্ধতিতে এস্তেতিন হয়ে উঠবে এক অভাবনীয় হাতিয়ার।
সর্বোপরি বলা যায়, এস্তেতিন কেবল একটি মৌল নয়, এটি বিজ্ঞানের চোখে এক চরম প্রতীক—দুর্লভতার, রহস্যের এবং সম্ভাবনার। এর মাত্র ২৮ গ্রাম অস্তিত্ব সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকলেও, তা মানব জ্ঞান ও গবেষণার জগতে সৃষ্টি করেছে বিশাল এক কৌতূহল এবং আগ্রহ। এই দুর্লভ মৌল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান এখনো অনেক কিছু জানে না, এবং এই অজানাকে জানার পথেই নিহিত আছে জ্ঞানের প্রকৃত আনন্দ। প্রকৃতিকে জানার, বুঝার, আর আবিষ্কারের এই অবিরাম যাত্রায় এস্তেতিন এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বিজ্ঞানমনস্ক মানবজাতির কাছে।