প্রতিদিন মানুষের নখ ০.০০০০৭ ইঞ্চি বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তন হয়তো আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস ও বিবর্তনগত দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা যখন আমাদের হাতের দিকে তাকাই, তখন নখকে খুব সাধারণ একটি অঙ্গ বলেই মনে হয়, অথচ এই অতি সাধারণ উপাদানটিই মানবদেহে নানা উপায়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
মানুষের নখ মূলত কেরাটিন নামক এক ধরনের শক্ত প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এই কেরাটিন শুধু নখেই নয়, আমাদের চুল, ত্বক এবং পশুদের শিং বা পালকেও বিদ্যমান। নখ গঠনের মূল কেন্দ্র হলো ‘নেইল matrix’ বা নখের মূল কোষ যা আমাদের নখের গোড়ায় থাকে। এই matrix ক্রমাগতভাবে নতুন কোষ তৈরি করে এবং পুরাতন কোষগুলো ধীরে ধীরে ঠেলতে ঠেলতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ফলস্বরূপ নখ দৈনিক একটু একটু করে বড় হতে থাকে।
যদিও প্রতিদিন মাত্র ০.০০০০৭ ইঞ্চি বৃদ্ধি হয় শুনতে খুবই নগণ্য মনে হয়, মাস বা বছরের হিসেবে এটি হয়ে দাঁড়ায় চোখে পড়ার মতো। এক মাসে গড়ে একটি নখ প্রায় ৩ মিলিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ ছয় মাসে একটি সম্পূর্ণ নখ নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। তবে এই বৃদ্ধির হার একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। বয়স, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জিনগত বৈশিষ্ট্য এমনকি পরিবেশগত কারণও এ বৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলে।

বয়স যত বাড়ে, নখের বৃদ্ধি ততই ধীর হতে থাকে। শিশুদের এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে এই হার তুলনামূলক বেশি থাকে। আবার, হাতের নখ পায়ের নখের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর পেছনের একটি যুক্তি হলো রক্ত সঞ্চালন এবং ব্যবহারের হার। যেসব আঙুল বেশি ব্যবহার হয়, যেমন ডানহাতের তর্জনী বা মধ্যমা, সেসব আঙুলের নখ তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাড়তি রক্তপ্রবাহ এবং স্নায়বিক উদ্দীপনার কারণে এই ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
নখের বৃদ্ধি হার আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। একজন সুস্থ মানুষের নখ সাধারণত মসৃণ ও একটানা বাড়তে থাকে। কিন্তু যদি কারো দেহে পুষ্টির ঘাটতি থাকে, বিশেষত আয়রন, জিঙ্ক বা ভিটামিন বি-এর অভাব দেখা যায়, তবে তা নখে প্রতিফলিত হয়। নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, ফেটে যাওয়া বা অস্বাভাবিক আকার ধারণ করাও হতে পারে ভেতরের অসুস্থতার লক্ষণ।
অনেক সময় আমরা খেয়াল করি, মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় নখ কামড়ানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। একে বলা হয় ‘onychophagia’। এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে নখের বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং matrix-এর ক্ষতি করে ফেলতে পারে। কেউ কেউ আবার সৌন্দর্যের জন্য নখ কেটে বা ঘষে বিশেষ রূপ দেয়, যা একদিকে রুচিশীলতার প্রতীক হলেও অপরদিকে নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নখ নিয়ে মানুষের আগ্রহ আদিকাল থেকেই ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা নখে রঙ ব্যবহার করতো তাদের সমাজের মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য। চীনের রাজপরিবারে দীর্ঘ নখ ছিল ধনসম্পদ ও অবসরের প্রতীক। তাদের বিশ্বাস ছিল, যারা কাজ করে না তারা লম্বা নখ রাখতে পারে। এখনো অনেক সমাজে লম্বা নখের একটি নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আধুনিক যুগে নখ একটি রূপচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেইল আর্ট, নেইল পলিশ, নেইল এক্সটেনশন ইত্যাদি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নানা বয়সী মানুষের মধ্যে। এর পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসাগত বিষয়ও। ডার্মাটোলজি শাস্ত্রে নখের রোগ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়। ফাঙ্গাল সংক্রমণ, ছত্রাক, সোরায়াসিস, প্যারোনিকিয়া প্রভৃতি সমস্যা বহু মানুষকে ভোগায়। তাই নখের পরিচর্যা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য রক্ষারও অংশ।
বিজ্ঞানীরা নখের বৃদ্ধির হার নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, একমাত্র পেটির নখ বা সামনের মাঝের আঙুলের নখ সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে। আর সবচেয়ে ধীরে বাড়ে বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ। আবার, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় নখের বৃদ্ধি তুলনামূলক কমে যায়, গরম বা উষ্ণ আবহাওয়ায় তা বাড়ে। দিনের আলোর উপস্থিতি, ভিটামিন D-এর মাত্রাও এতে প্রভাব ফেলে।
নখের আকৃতি এবং বৃদ্ধি অনেকাংশে আমাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। কারো নখ মোটা ও শক্ত, আবার কারো নখ পাতলা এবং ভঙ্গুর। এটি একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়, যদিও জীবনযাপনের ধরন ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব। যারা নিয়মিত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও বায়োটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করেন, তাদের নখ স্বাস্থ্যবান ও দ্রুত বাড়ে।
একটি মজার তথ্য হলো, মহাকাশে থাকা মহাকাশচারীদের নখের বৃদ্ধি হারও পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীর অভিকর্ষশূন্য পরিবেশে শরীরের অন্যান্য প্রক্রিয়ার মতো নখের বৃদ্ধির হারেও হেরফের ঘটে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা মানুষের কোষীয় বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণার একটি নতুন মাত্রা খুঁজে পান।
তবে শুধু বৃদ্ধি নয়, নখের শক্তি এবং স্থায়িত্বও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন নখ অনেক ধরণের চাপ সহ্য করে – যেমন টাইপ করা, দরজা খোলা, কাপড় কাটা, রান্না ইত্যাদি। এতকিছুর পরেও যদি নখ সহজে ভেঙে না পড়ে, তবে বুঝতে হবে সেটি সুস্থ আছে।
অনেক সময় কোনো ব্যক্তির নখে হঠাৎ সাদা দাগ দেখা যায়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি ক্যালসিয়ামের অভাবে হয়। যদিও এই ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এটি মূলত আঘাতের কারণে matrix-এ সাময়িক ক্ষতি হওয়ার ফলাফল, যা পরে সাদা দাগ হিসেবে ধরা পড়ে। তাই এতে চিন্তার কিছু নেই, এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়।

বেশ কিছু মানুষের নখে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বাঁক থাকে। এটি জন্মগত হলেও, মাঝে মাঝে এটি সেরোসিস, হার্ট ডিজিজ বা লিভার সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই হঠাৎ নখের রঙ, গঠন বা বৃদ্ধি হঠাৎ পরিবর্তিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নখের অগ্রভাগে এক ধরনের অর্ধচন্দ্রাকৃতি সাদা অংশ দেখা যায়, যাকে ‘লুনুলা’ বলা হয়। এটি নখের matrix-এর দৃশ্যমান অংশ, যা কার্যত নখ বৃদ্ধির মূল কেন্দ্র। যদিও এটি সবার ক্ষেত্রে স্পষ্ট দেখা যায় না, তবে লুনুলা সঠিকভাবে কাজ না করলে নখের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেমন একটি নিখুঁত যন্ত্রের মতো কাজ করে, তেমনি নখও। এটি শুধু চেহারার সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের স্নায়বিক এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ। হাতের আঙুলের ডগায় নখ না থাকলে আমরা অনেক সূক্ষ্ম কাজ করতে পারতাম না। নখ আমাদের আঙুলের অনুভূতির পরিধি বাড়ায় এবং কিছু ধরার সময় অতিরিক্ত সহায়তা করে।
আবার, নখের নিচে থাকা টিস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেকোনো ক্ষত বা আঘাত সহজেই যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। এজন্য নখ কাটা বা পরিষ্কার করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। অতিরিক্ত গভীরভাবে নখ কাটা হলে ইনগ্রোন নেইল বা ভিতরে ঢুকে যাওয়া নখের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা খুবই কষ্টদায়ক।
নখ শুধু মানুষেই নয়, প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রাণীতে থাকে। যদিও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার ভিন্ন – কেউ শিকার করতে, কেউ আত্মরক্ষায়, কেউ গর্ত খুঁড়তে ব্যবহার করে। মানুষের বিবর্তনে এই নখ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে এখন প্রধানত ব্যবহারিক ও নান্দনিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এইভাবে প্রতিদিন ০.০০০০৭ ইঞ্চি নখ বাড়লেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি বিশাল বিজ্ঞান, দীর্ঘ বিবর্তন, স্বাস্থ্য নির্দেশক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। এক টুকরো নখ আমাদের জীবনের কত দিক নির্দেশ করে – ভাবলে অবাক হতে হয়।