
“গরুকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠানো যায় কিন্তু নিচে নামানো যায় না” — এটি একটি বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদ। এই প্রবাদের আক্ষরিক অর্থ হতে পারে: গরু হলো এমন একধরনের প্রাণী, যাকে জোর করে বা কৌশলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে তোলা গেলেও, যখন তাকে নিচে নামানোর সময় হয়, তখন সে পিছনে হাঁটতে না জানায় বা উচ্চতা বুঝে ভয় পায়, ফলে নামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে এই প্রবাদটির মূল তাৎপর্য আক্ষরিক নয়, বরং রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে কাউকে বা কোনো কিছুকে একটি স্তরে বা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া গেলেও, তা থেকে নামিয়ে আনা বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের আমরা নিজের চেষ্টায় বা কারও সুপারিশে, কোনো কারণে উচ্চপদে বসাতে সাহায্য করি। কিন্তু একবার তারা সেই উচ্চাসনে বসে গেলে, তখন আর তাদের সেখান থেকে সরানো যায় না। তারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে বসে থাকেন। তারা তাদের অবস্থানকে ব্যবহার করতে শুরু করেন নিজের স্বার্থে, এবং ক্রমশ অস্পৃশ্য হয়ে ওঠেন। এমন অনেক রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা পারিবারিক পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে কাউকে একবার ‘উপরে’ তোলা হলে, সে আর সহজে ‘নিচে’ নামতে চায় না, এমনকি নামানোও যায় না। এই প্রবাদটি মূলত এমন আচরণ বা বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

শুধু মানুষ নয়, কোনো একটি ভুল সিদ্ধান্ত, কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি— যেটিকে শুরুতে খুব ভালো মনে হয়েছিল, সেটিকে শুরু করে ফেলার পর একসময় বোঝা যায় যে এটি তেমন কার্যকর নয় বা ক্ষতিকর, তখন তা বন্ধ করা যায় না বা বন্ধ করলেই বিপত্তি ঘটে। এ রকম অবস্থাকেও বোঝাতে এই প্রবাদটি প্রয়োগ করা যায়। অর্থাৎ, একবার কোনো কিছু শুরু করে দিলে বা কোনো উচ্চতায় পৌঁছে দিলে, তা থামানো বা ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া এই প্রবাদটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতারও একটি বার্তা দেয়। অর্থাৎ, আমরা কোনো কিছু করার আগে তার ফলাফল বা পরবর্তী ধাপগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে, অন্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। কারণ অনেক সময় শুরুটা সহজ হলেও, সেটার শেষটা বিপদজনক হতে পারে। গরুকে যদি উপরে ওঠানো হয় শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক লাভের চিন্তায়, তাহলে নামানোর সময় যে বিপদ হতে পারে তা কেউ ভাবেন না। এই প্রবাদের মাধ্যমে তাই এক ধরনের শিক্ষণীয় সতর্কতা প্রকাশ পায়— আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ভাবনাচিন্তা করে নেওয়া উচিত।
এই প্রবাদের আরেকটি তাৎপর্য হলো একধরনের কর্তৃত্ববাদী পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত। সমাজে, অফিসে বা রাজনীতিতে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে একবার কাউকে ক্ষমতায় বসানো হলে, সে নিজের অবস্থানকে আঁকড়ে ধরে রাখে এবং স্বেচ্ছায় সরে আসতে চায় না। সেই মানুষটি হয়তো শুরুতে যোগ্য ছিল, কিন্তু পরে তার যোগ্যতা হারিয়ে গেলেও, কিংবা তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও তাকে সরানো যায় না— কারণ তখন সে হয়ে গেছে “সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা গরু”, যাকে আর নিচে নামানো সম্ভব নয়। এই অবস্থায় সিস্টেম বা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র।
এই প্রবাদের মাধ্যমে আবার কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক বা মানসিক জড়তাকেও বোঝানো যায়। অনেক মানুষ আছেন, যারা কোনো একধরনের আত্মবিশ্বাস বা ক্ষমতা অর্জনের পর, তা হারানোর ভয়ে নিচে নামতে চান না। তারা এমন এক মনের অবস্থায় চলে যান, যেখানে তারা নিজেদের স্বাভাবিক রূপ ভুলে, কেবল উচ্চতা বা অবস্থান ধরে রাখার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত হন। এমন একটি মানসিকতা মানুষের ব্যক্তিত্বকে বিকৃত করে তোলে। এই প্রবাদ তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু উপরে ওঠা নয়, প্রয়োজনে নিচে নামতেও জানাটা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আবার এই প্রবাদটি শিক্ষা দেয় যে, অনেক সময় আমাদের পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প বা প্রযুক্তিগত উদ্যোগ এমন পর্যায়ে চলে যায়, যেখান থেকে পিছিয়ে আসা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন ধরুন, একটি সরকার কোনো একটি বড় প্রকল্প শুরু করল— যেমন বিশাল সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। প্রথম দিকে সেই প্রকল্প ভালো মনে হলেও পরে দেখা গেল সেটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর, পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক বা বাস্তবায়নে ব্যর্থ। কিন্তু ততদিনে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ হয়ে গেছে, রাজনীতির সম্মান জড়িয়ে গেছে, ফলে কেউ আর তা থেকে সরে আসতে চায় না বা পারেও না। এই অবস্থাও সেই গরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছে, এখন নামাতে গেলেই বিপদ।

এই প্রবাদটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা সামাজিক স্তরেই নয়, অনেক সময় ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অনুশাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক রীতিনীতি আছে যেগুলো এক সময় প্রচলিত হয়েছিল ভালো উদ্দেশ্যে, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে তা আর প্রযোজ্য নয়। তারপরেও মানুষ সেগুলিকে আঁকড়ে ধরে থাকে কারণ এগুলোকে বদলানো কঠিন, সমাজে গ্রহণযোগ্যতা নেই বা পরিবর্তন মানেই বিপর্যয়— এই ভয়ে। ফলে এক ধরনের অব্যবহারযোগ্য সংস্কৃতি টিকে থাকে শুধুমাত্র কারণ তা একবার শুরু হয়ে গিয়েছে। ঠিক যেমন একটি গরুকে একবার সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে দিলে, তা আর নিচে নামানো যায় না— তেমনি একবার প্রচলিত কিছু পরিবর্তন করতে গেলে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়।
সবশেষে বলা যায়, এই প্রবাদের মধ্যে একদিকে যেমন বাস্তব জীবনের একটি তীক্ষ্ণ রূপক রস আছে, তেমনি এর মধ্যে সমাজ, রাজনীতি, মানুষ, চিন্তা ও চর্চার বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণও করা যায়। আমরা প্রতিনিয়ত জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই প্রবাদের বাস্তবতা উপলব্ধি করি— হোক তা আমাদের অফিসের বস, পরিবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, কোনো জনপ্রতিনিধি, অথবা এমনকি নিজের ভেতরের অহংবোধ। এই প্রবাদটি আমাদের শেখায়, প্রতিটি সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীলতা ও দূরদৃষ্টি থাকা জরুরি। কারণ অনেক সময় একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে এমন অবস্থার সৃষ্টি করে, যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। গরুকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠানো যায়— এই অংশ সহজ, কিন্তু নিচে নামাতে না পারার যে অসহায়তা, সেটিই আমাদের বারবার সাবধান করে দেয়।